blog-img
চার সপ্তাহ পরও নেপালের বন্যার ক্ষত, নিখোঁজ ৬ হাজার, মৃত ১৪৫১
10 hours ago
2 K Views
0 comments

চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নেপালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো শুকায়নি। কোথাও ধ্বংসস্তূপের নিচে, কোথাও নদীর তীরে চলছে নিখোঁজদের খোঁজ। এরই মধ্যে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫১ জনে। এখনো প্রায় ৬ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।


গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকা থেকে শুরু হয় এই বিধ্বংসী বন্যা। মুহূর্তের মধ্যে ফুলে-ফেঁপে ওঠে ভোতেকোশি নদী। প্রবল স্রোতে ভেসে যায় বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, যানবাহন ও পুরো বসতি। উত্তর ও মধ্য নেপালের বহু শহর ও গ্রাম পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।


রবিবার প্রকাশিত নেপাল পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযানে আরও মরদেহ পাওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৫১ হয়েছে।


সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ান জেলায়। সেখানে ৩৬৭ জনের লাশ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রসুয়া থেকে ২৩৬টি, নাওয়ালপারাসি পূর্ব থেকে ২৩২টি এবং নাওয়ালপারাসি পশ্চিম থেকে ২২২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।


নুয়াকোট জেলায় ২০৩ জন, গোরখায় ৭৯ জন, ধাদিংয়ে ৭২ জন এবং তানাহু জেলায় ৩৮ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে।


কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপ ও নদীগর্ভে আরও বহু মরদেহ আটকে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাই বন্যার এক মাস পার হতে চললেও উদ্ধার অভিযান বন্ধ করা হয়নি।


রসুয়া ও আশপাশের জেলাগুলোতে নদীর তীর, ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটিতে চাপা পড়া এলাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক তল্লাশি চলছে।


এর মধ্যে রসুয়ার আপার ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্ধারকাজ সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। সেখানে কাদামাটি ও লোহার রডের জালের মধ্যে আটকে থাকা ১৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। এসব মরদেহ বের করতে গ্রাইন্ডার, গ্যাস কাটার ও রোটারি যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে।


এর আগে নেপাল সেনাবাহিনীর এক ফিল্ড কমান্ডার জানিয়েছিলেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ সরাতে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।


পরিচয় শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ


উদ্ধারকাজের পাশাপাশি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা।


কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া অনেক মরদেহ দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে পচে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতবিক্ষত বা শরীরের অংশবিশেষ উদ্ধার হওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।


এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩০০ অজ্ঞাত মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর এসব মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।


এখন পর্যন্ত মাত্র ১১০টি মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।


প্রাণহানির পাশাপাশি বন্যায় নেপালের অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বহু মানুষ এখনো ঘরে ফিরতে পারেননি। অসংখ্য বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় হাজারো পরিবার অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে।


ত্রিশুলি করিডরের বিভিন্ন ঝুলন্ত সেতু বন্যায় ভেঙে যাওয়ায় নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বহু এলাকা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সরকার ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সেতুগুলো মেরামতের কাজ শুরু করেছে।


তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বাজার, স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য জরুরি সেবায় পৌঁছানো এখনো অত্যন্ত কঠিন। অনেক এলাকায় সড়ক ধসে যাওয়ায় ত্রাণ ও নির্মাণসামগ্রী পৌঁছাতেও বিলম্ব হচ্ছে।


জলবিদ্যুৎ খাতে বড় ধাক্কা


বন্যায় নেপালের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও কাদামাটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল ও যন্ত্রপাতি ভরাট করে দিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানও জটিল হয়ে উঠেছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্প সচল করতে দীর্ঘ সময় এবং বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রয়োজন হবে।


অনিশ্চয়তায় স্বজনদের অপেক্ষা


চিতওয়ানের অস্থায়ী শনাক্তকরণ কেন্দ্রে প্রতিদিন শত শত পরিবার নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে ভিড় করছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দেখে কিংবা ডিএনএ পরীক্ষার আশায় অপেক্ষা করছেন অনেকে।


নেপাল সরকার বলছে, নিখোঁজদের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

Comments 0

Your Comment