ব্যক্তিগত কাজে কয়েকদিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। দুবাই বিমানবন্দরে ফ্লাইটের অপেক্ষা করছি। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ঘরে ফিরছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। আমাকে দেখে অনেকে এগিয়ে এলেন। কথা বললেন। ছবি তুললেন কেউ কেউ। তারা ভালো আছেন কি না জানতে চাইলাম। সবাই মাথা নাড়লেন। তারপর একজন বললেন, ভাই বাহরাইন থেকে এসেছি। ভয়ে থাকি দেশে ফেরার সময়। জানতে চাইলাম কীসের ভয়? কার ভয়? সবই তো ঠিক আছে। সমস্যা হলে জানাবেন। এ সময় কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভীষণ হেনস্তার শিকার হই যাওয়া-আসার পথে। আমাদের মানুষই মনে করে না বিভিন্ন সংস্থার লোকজন। কষ্ট দেওয়াই তাদের কাজ। ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, আনসার, আর্মড পুলিশ সবার টার্গেট প্রবাসী। বিশ্বাস করুন ভাই, নিরীহ শ্রমিকদের রক্তের টাকা, বিভিন্ন জিনিস তারা ছিনিয়ে নেয়। তাদের বুক কাঁপে না। বললাম, এমন করলে বিচার চান না কেন? জবাবে তারা বললেন, কার কাছে বিচার দেব? বিচার দিলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। ঝামেলা বাড়ে। সব হজম করে যাই। ভয় পাই। মনে পড়ে লন্ডনপ্রবাসী সিলেটের সুরত মিয়ার কথা। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টমসের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাকে প্রকাশ্যে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল পিটিয়ে। সুরত মিয়ার পরিবার আজও বিচার পায়নি। প্রবাসীরা ঢাকায় নেমে সুরত মিয়া হওয়ার ভয়ে থাকেন। সুরত মিয়ার সঙ্গে কী হয়েছিল বিমানবন্দরে, কারও কি মনে আছে? ব্রিটেনের নিউক্যাসেলের ব্যবসায়ী সুরত মিয়া ১৯৯৬ সালের ৯ মে কেএলএমের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় অবতরণ করেন। এ সময় তার কাছে নগদ ৪ হাজার পাউন্ড ছিল। টাকা দেখে কাস্টমস কর্মকর্তাদের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। তারা ঘুষ দাবি করেন তার কাছে। সুরত প্রতিবাদ জানান। এ প্রতিবাদই কাল হয়ে দাঁড়ায়। কাস্টমস কর্মকর্তারা তাকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোনে লোকজনের সামনেই পেটাতে থাকেন। কাস্টমস কর্মকর্তাদের হাতে ছিল কাঠের টুকরা। সুরত চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমাকে আর মেরো না। সব টাকা নিয়ে যাও। সব তোমরা নিয়ে যাও। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সুরত। সুরত হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে প্রবাসীরা আন্দোলন করেছিলেন। ২৭ বছর পার হয়ে গেল। সুরতের পরিবার আজও বিচার পায়নি। বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে। সুরতের আত্মা ঘুরছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেদিন সুরত হত্যার বিচার হলে আজ আর হয়রানিতে পড়তেন না প্রবাসীরা।