আগুনে স্বপ্ন পুড়ে ছাই
আগুনে স্বপ্ন পুড়ে ছাই
Ajker highlights
প্রকাশ:
ইতালি প্রবাসী সৈয়দ মোবারক হোসেন কাউছারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল পরিবারের সবাইকে নিয়ে ইতালি যাবেন। বাকিটা জীবন কাটাবেন তারা সেখানেই। তার সেই স্বপ্ন পূরণও হতে যাচ্ছিল। আগামী মাসেই তাদের ইতালি যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। শেষ গোছগাছ চলছিল তাদের। কিন্তু বেইলি রোডের সেই ভয়াবহ আগুনে তাদের সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তাদের বিদেশ যাওয়া হলো না। পাঁচজনের পুরো পরিবারের ঠিকানা হলো না ফেরার দেশে। গতরাতেই রিয়ার মালয়েশিয়া যাওয়ার ফ্লাইট ছিল। আগের দিন গেল শপিং করতে ও তাদের এক আন্টির সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে গিয়ে আর ফেরেনি। রিয়ার সঙ্গে ছিল ছোট বোন আলিশা এবং তাদের এক খালাতো বোন নিমু। তিনজনই কেনাকাটা করে গিয়েছিল কাচ্চি ভাইতে। তিনজনই এখন আর বেঁচে নেই। রিয়া আর আলিশার লাশ ধরে কাঁদছিলেন তাদের বাবা কোরবান আলী। বলছিলেন, আমার সব স্বপ্ন শেষ। মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী ছিল রিয়া। এখন আমি কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখব? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের ২২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নাহিয়ান আমিন। বুয়েটের আরেক শিক্ষার্থী যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২২ ব্যাচের লামিশা ইসলাম। দুই বন্ধু গিয়েছিল কাচ্চি ভাইতে। তারা আর ফিরে আসেনি। তাদের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে ভয়ংকর আগুনে। শুধু এ কজনের স্বপ্নই নয়, স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়েছে তাদের মতো আরও অনেকের। বৃহস্পতিবার রাতে বেইলি রোডের সাত তলা ভবনের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে রেস্টুরেন্ট। আর দুই ঘণ্টার আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন। উচ্চমাধ্যমিকের লেখাপড়া শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল নুসরাতের। আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে বাবাকে ফোনে বলেছিল, ‘আব্বু, আগুন! আমাদের বাঁচান।’ নুসরাতকে কেউ বাঁচাতে পারেনি। বড় সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন অভিশ্রুতি। জীবনের শুরুতেই শেষ হয়ে গেল সব। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আর বোনকে আগলে রাখা লামিসাও চলে গেলেন আগুনে। বুয়েট শিক্ষার্থী লামিসার স্বপ্ন ছিল, অনেক বড় প্রকৌশলী হবেন। বুয়েটের অপর শিক্ষার্থী নাহিয়ান ছিলেন পরিবারের একমাত্র আশা। সেদিন ছিল সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার, তার ওপর অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার! খাবারের সঙ্গে বেশ আড্ডা জমেছিল বেইলি রোডের রেস্টুরেন্টগুলোতে। এ দিনটিকে উদযাপন করতে অনেকেই রেস্টুরেন্টে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কাচ্চি ভাইতে ছিল বিশেষ ছাড়। যে কারণে অন্যান্য দিনের চেয়ে সেই সন্ধ্যায় ভিড় ছিল একটু বেশি। রাত পোনে ১০টার ভয়ংকর আগুনে সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে। ঝলমলে রেস্টুুরেন্টটি হয়ে ওঠে তখন মৃত্যুকূপ। হুড়োহুড়ি ছোটাছুটিও কেউ করতে পারছিল না। আগুনকেই যেন নারী পুরুষ ও শিশুরা আলিঙ্গন করতে বাধ্য হয়েছিল। রেস্টুরেন্টের সব সিঁড়ি ছিল আটকা। আর তাতেই আটকে যায় সবাই। একে একে মৃত্যুবরণ করতে থাকে। এক সময়ে জানা যায় ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর এই মৃত্যুতে পরিবারগুলো শুধু প্রিয় স্বজনকেই হারালো না, তাদের আশা-আকাক্সক্ষারও মৃত্যু ঘটল।
মন্তব্য (০)
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।