blog-img
ইসরায়েলি দূতাবাস উদ্বোধন, স্লোভেনিয়ায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ
4 hours ago
1.8 K Views
0 comments

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশ স্লোভেনিয়ায় ইসরায়েলের প্রথম দূতাবাস উদ্বোধনের প্রতিবাদে রাজধানী লুবলিয়ানায় হাজারো মানুষ বিক্ষোভ ও মিছিল করেছেন। 


বুধবার দূতাবাস উদ্বোধনের সময় ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির নতুন কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করে রাস্তায় নামেন বিক্ষোভকারীরা।


স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইয়ানেজ ইয়ানশা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পর এই বিক্ষোভ হলো। এর মাধ্যমে তার পূর্বসূরি রবার্ট গোলবের সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গোলবের সরকার গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল।


লুবলিয়ানায় বিক্ষোভকারীরা দূতাবাস উদ্বোধনের অনুষ্ঠানস্থল হিসেবে ব্যবহৃত একটি হোটেলের পাশ দিয়ে মিছিল করেন। তাদের হাতে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল—‘শান্তি ও ফিলিস্তিনের জন্য আমরা একসঙ্গে’ এবং ‘গণহত্যা আত্মরক্ষা নয়’।


৪৮ বছর বয়সী শিল্প-ইতিহাসবিদ উরস্কা ব্রেজনিক প্রধানমন্ত্রী ইয়ানশার সরকারকে ‘সহযোগিতার সরকার’ বলে অভিহিত করেন। আরেক বিক্ষোভকারী মেলিনা সাহেরনিক বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সরকারের এই ঘনিষ্ঠতা স্লোভেনিয়ার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।


জনমতের সঙ্গেও মিলছে না সরকারের নীতি

ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে স্লোভেনিয়া সরকারের নতুন নীতি দেশটির সাধারণ মানুষের মনোভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।


জুনে স্লোভেনিয়ার দৈনিক দেলো পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের বিরোধিতা করেন। বিপরীতে মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ এমন সম্পর্কের পক্ষে মত দেন।


স্লোভেনিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক আন্দ্রাজ জোরকো অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, প্রায় ২০ লাখ মানুষের দেশটিতে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির এই পরিবর্তন জনমতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


তার ভাষায়, স্লোভেনিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হয় ইসরায়েলের বিরোধী, নয়তো এ বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছেন।


ইয়ানশার অভিশংসন চায় বিরোধীরা

প্রধানমন্ত্রী ইয়ানশার ইসরায়েলপন্থী নীতির বিরোধিতা করে বুধবার দেশটির পার্লামেন্টে তাকে অভিশংসনের প্রস্তাব দিয়েছে ফ্রিডম মুভমেন্ট ও লেফট পার্টি।


সাবেক প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলবের নেতৃত্বাধীন উদারপন্থী ফ্রিডম মুভমেন্টের অভিযোগ, ইয়ানশার পররাষ্ট্রনীতি মূলত ইসরায়েলের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।


বিরোধীরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী টোনে কাজেরকেও পদ থেকে সরানোর দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মার্চের নির্বাচনে ইয়ানশাকে ইসরায়েল সমর্থন দিয়েছিল এবং দূতাবাস উদ্বোধনের মাধ্যমে সেই সমর্থনের ‘প্রতিদান’ দেওয়া হচ্ছে।


গোলব সরকারের সময়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ

রবার্ট গোলবের নেতৃত্বাধীন আগের সরকার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। সেই সময়ে স্লোভেনিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়।


এছাড়া ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরায়েলের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার স্লোভেনিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ছিলেন।


তবে ইয়ানশা ক্ষমতায় আসার পরপরই স্লোভেনিয়ার সরকারি ভবন থেকে ফিলিস্তিনি পতাকা সরিয়ে ফেলা হয়। ভবনটিতে স্লোভেনিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউক্রেনের পতাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের পতাকাও ছিল। পরে তার সরকার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নেওয়া আগের প্রায় সব পদক্ষেপ বাতিল করে।


দূতাবাস উদ্বোধনকে ‘ঐতিহাসিক দিন’ বললেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী

দূতাবাস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্লোভেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টোনে কাজের বলেন, এই উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে আরও বেশি সংলাপ ও শক্তিশালী সহযোগিতার সূচনা করবে।


তিনি বলেন, দূতাবাস উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এমন একটি সময়ের সূচনা হওয়া উচিত, যেখানে দুই দেশের মধ্যে আরও বেশি সংলাপ, শক্তিশালী সহযোগিতা এবং জনগণের স্বার্থে আরও বাস্তব ফলাফল অর্জিত হবে।


অনুষ্ঠানে যোগ দিতে স্লোভেনিয়ায় যান ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’আর। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দিনটিকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।


গিদিয়ন সা’আর বলেন, দূতাবাস উদ্বোধন ইসরায়েলের সঙ্গে স্লোভেনিয়ার বন্ধুত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রতি ইসরায়েলের অঙ্গীকারের স্পষ্ট প্রকাশ। তিনি স্লোভেনিয়ার সরকার ও প্রধানমন্ত্রী ইয়ানশার ইসরায়েলের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।


গাজা যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েলের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা

স্লোভেনিয়ায় ইসরায়েলের দূতাবাস উদ্বোধনের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে দেশটির দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে।


দূতাবাস উদ্বোধনের মাত্র একদিন আগে যুক্তরাজ্য অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানায় ফ্রান্স ও কানাডাও।


ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর এসব পদক্ষেপকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে অসন্তোষের প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতারও ইঙ্গিত মিলছে।


তবে পশ্চিমা মিত্রদের এসব পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তের জবাবে জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল।


ফলে একদিকে স্লোভেনিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হলেও অন্যদিকে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

Comments 0

Your Comment