ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা না চালাতে ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি সরকারকে সতর্ক করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।
ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এর এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর পরিবর্তে কূটনৈতিক পথে এগোনোই ইসরায়েলের জন্য বেশি কার্যকর হবে। একই সঙ্গে হুতিদের আঞ্চলিক প্রভাব ও ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলায় একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধারণা, বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা গেলে হুতিদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইরানের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা সহজ হবে।
সরাসরি হামলার বদলে কূটনৈতিক উদ্যোগ
হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহল মনে করছে, ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে এককভাবে সামরিক অভিযান চালালে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। বরং হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।
নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা শুধু ইসরায়েলের বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ। ফলে হুতিদের কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে বৃহত্তর জোট গঠন করা গেলে ইসরায়েল কূটনৈতিকভাবে বেশি সুবিধা পেতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হবে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখা। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, হুতি ইস্যুকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করলে ইরানের ভূমিকা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বাড়লে হুতিদের নিয়ে উদ্বেগ
হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েল এখন এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হলে তেহরান হুতিদের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সক্রিয় করতে পারে।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহলের আশঙ্কা, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাত বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে তেহরান পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে ইয়েমেনভিত্তিক হুতিরাও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালাতে পারে।
এই আশঙ্কার কারণেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইয়েমেনে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন অভিযান শুরু করার পরিবর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও কূটনৈতিক উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
হুতি-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলা
গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের সময় হুতি ও ইসরায়েলের মধ্যে একাধিকবার পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। হুতিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। এর জবাবে ইসরায়েল ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে।
হুতিদের সামরিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের এলাকা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের পার্থক্য?
হুতিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সরকারের সামরিক অবস্থান নিয়ে এর আগে একাধিকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির উগ্র ডানপন্থি রাজনৈতিক মহল আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এর বিপরীতে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সতর্ক অবস্থান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানকে ঘিরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও কৌশলগত মতপার্থক্য রয়েছে।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, হুতি ইস্যুতে ইসরায়েল এককভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং একই সঙ্গে ইরানকে পরোক্ষভাবে আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
তাই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পরামর্শ হলো—হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি নতুন হামলা চালানোর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা, বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তাকে বৈশ্বিক স্বার্থের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা এবং ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখা।
তবে ইসরায়েলি সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে যেসব নিরাপত্তা কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, তাদের নামও প্রকাশ করা হয়নি।