প্লাস্টিক বর্জ্য, শেওলা আর মারাত্মক দূষণে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল নদীটি। প্রশাসনের আশায় বসে না থেকে সেটি নিজে হাতে পরিষ্কার করার কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন এক ২১ বছর বয়সী তরুণ। ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার এই সাধারণ তরুণের অসাধারণ সামাজিক উদ্যোগ আজ অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
ইন্টারনেট দুনিয়ায় ‘বিট্টু তাবাহি’ নামে পরিচিত সুরেন্দ্র সিং চৌধুরী নামের এই তরুণ আজনার নদী পরিষ্কার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হয়েছেন। তার এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা শুধু দেশজুড়ে প্রশংসাই কুড়ায়নি, বরং তাকে এনে দিয়েছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থার লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিজেদের সঙ্গে কাজ করার এই আহ্বান জানান।
বিট্টু তাবাহি প্লাস্টিক বর্জ্য, ক্ষতিকর শেওলা ও জমে থাকা ময়লা-আবর্জনায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়া পুরো আজনার নদীটিকে নিজ দায়িত্বে পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। নদী সাফাইয়ের এই পুরো প্রক্রিয়ার দৃশ্য ধারণ করে তৈরি ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই তা দ্রুত নেটিজেনদের নজর কাড়ে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘দ্য ওশান ক্লিনআপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বয়া সেন স্ল্যাট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) সুরেন্দ্রর কাজের একটি পোস্ট দেখতে পান। সেখানে তুলে ধরা হয় কীভাবে এক তরুণ মাসের পর মাস ধরে একাই লড়াই করে একটি মারাত্মক দূষিত নদীকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন এবং সঙ্গে যুক্ত করা হয় নদীটির আগের ও পরের রূপান্তরের ছবি। বিট্টুর এই অভাবনীয় উদ্যোগ দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়ে বয়া সেন স্ল্যাট রিটুইট করে সরাসরি একটি সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী প্রস্তাব দিয়ে লেখেন, ‘এসো, আমাদের সাথে কাজ করো।’
বাস্তব জীবনে সুরেন্দ্র সিং চৌধুরী ওরফে ‘বিট্টু তাবাহি’ হলেন মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার বিয়োরা শহরের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশকর্মী। স্থানীয় আজনার নদীর তীরবর্তী একটি মন্দিরের কাছে জমে থাকা প্লাস্টিকের পাহাড়, শেওলা, ঘন কাদা ও দুর্গন্ধ দেখে চরমভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন তিনি। সরকারি পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা না করে তিনি নিজেই মাঠে নেমে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। গত ২৬ জানুয়ারি, অর্থাৎ ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নদী পরিষ্কার অভিযান শুরু করেছিলেন।
শুরুতে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে পেলেও খুব দ্রুতই এই অভিযান তার একার একক মিশনে পরিণত হয়। সাঁতার না জানা সত্ত্বেও এবং কোনো ধরনের পেশাদার সুরক্ষাসামগ্রী বা আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই অতি সাধারণ কিছু দেশীয় সরঞ্জাম হাতে নিয়ে তিনি নদী থেকে টনকে টন বর্জ্য নিজ হাতে তুলে আনেন।
এই কাজের সরঞ্জাম কেনার জন্য বিট্টু তার নিজের সঞ্চিত সব অর্থ ব্যয় করেন। নদী সাফাইয়ের এই হাড়ভাঙা খাটুনি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তার স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কাজের সময় তিনি একাধিকবার হাত-পায়ে মারাত্মক সংক্রমণ ও ত্বকের চুলকানিতে ভুগেছেন এবং বহুবার বিষাক্ত সাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।
খুবই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা বিট্টু বর্তমানে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গেই বসবাস করেন। তার এই অভাবনীয় সামাজিক কাজ তাকে রাতারাতি স্থানীয় নায়কে পরিণত করেছে। এমনকি বিষয়টির গুরুত্ব পৌঁছে গেছে মধ্যপ্রদেশের প্রশাসন পর্যন্ত। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব বিট্টু তাবাহির এই উদ্যোগের খবর পেয়ে তাকে মুখ্যমন্ত্রী ভবনে আমন্ত্রণ জানান এবং শুক্রবার রাতে তাদের মধ্যে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী বিট্টুর এই মহতী কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।